ঈশ্বরদীতে বিএনপির দুই গ্রুপে সংঘর্ষ, পুলিশ অফিসারসহ আহত অন্তত ৩৫ জন
স্টাফ রিপোর্টার।। ঈশ্বরদীতে বিএনপির বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে ।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার (২৩ মার্চ’২৬) দুপুরে শহরের রেলগেট থেকে পোস্ট অফিস মোড় পর্যন্ত এলাকায়।
সংঘর্ষে ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমারসহ বিএনপির উভয় গ্রুপের অন্তত ৩৫ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক আহত হয়েছেন।
এদের মধ্যে একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ ধারন করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৮ থেকে ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী ও র্যাব সদস্যদের ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যৌথ বাহিনী শহরে টহল শুরু করেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানাগেছে, সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব গ্রুপ এবং ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু গ্রুপের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
জানাগেছে,ঈদের আগের দিন রাতে হাবিব গ্রুপের কয়েকজন কর্মী ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিন্টু গ্রুপের পৌর যুব দলের ৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ রউফ আব্দুলকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করেন। এই ঘটনার জেরে পিন্টু গ্রুপের লোকজন হামলাকারীদের কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুর করেন। পরবর্তীতে হাবিব গ্রুপের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাকারিয়া পিন্টু ও তার ভাইদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে প্রচারণা চালানো হলে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।
এরই প্রেক্ষিতে সোমবার সকালে জাকারিয়া পিন্টুর ভাই মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে রেলগেট থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে এবং পরে ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের বিরুদ্ধে চলমান অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানায়। একই সময়ে হাবিবুর রহমান হাবিব গ্রুপ পাল্টা বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেই মিছিলের ব্যানারে পিন্টু ও তার ভাইদের সন্ত্রাসী উল্লেখ করে উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয়। সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ হাবিব গ্রুপের মিছিলটিকে থানার সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে পোস্ট অফিস মোড়ে যেতে অনুরোধ করে। কিন্তু মিছিলকারীরা পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে রেলগেটের দিকে এগিয়ে গেলে উভয় গ্রুপ মুখোমুখি হয় এবং সংঘর্ষ বেধে যায়।
হাবিব গ্রুপের আহত নেতাকর্মীদের মধ্যে সাবেক ছাত্রনেতা মাহাবুবুর রহমান পলাশ, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব রফিকুল ইসলাম রকি, ছাত্রনেতা নুরে আলম শ্যামল, লিটন, জাকারিয়া, আলমগীর, নাজমুল, নাসির, চঞ্চল, নান্টু, সেন্টু, আশরাফুজ্জামান ও কামরুল ইসলামের নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা গেছে। পিন্টু গ্রুপের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের মনোয়ার, রাজিব, অন্তর, কবির, পলাশ, আক্তার, শরিফ, শিহাব, ফজলু ও জুয়েলসহ ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন জানাগেছে। ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। ছাত্রনেতা নুরে আলম শ্যামলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে উত্তেজিত জনতা পোস্ট অফিস মোড়ে হাবিবুর রহমান হাবিবের কার্যালয়ের সামনে দুটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং কার্যালয়ের ভেতরে থাকা প্লাস্টিকের চেয়ারসহ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এই অবস্থায় আতঙ্কিত ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে সরে পড়েন এবং শহরে যানচলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে।
এবিষয়ে ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমারকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ অন্তত ৮ থেকে ১০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও র্যাব সদস্যরা শহরে টহল অব্যাহত রেখেছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. তাসনিম তামান্না স্বর্ণা জানান, ইট ও পাথরের আঘাতে আহত হয়ে কমপক্ষে ১৮ থেকে ২০ জন চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছিলেন।
হাবিব গ্রুপের মাহাবুবুর রহমান পলাশ অভিযোগ করেন, পুলিশের উপস্থিতিতেই মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে পিন্টু গ্রুপ তাদের মিছিলে অতর্কিত হামলা চালায়। এতে তিনিসহ দলের অন্তত ২০ থেকে ২৫ জন নেতাকর্মী আহত হন এবং মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয় ও কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়।
অন্যদিকে মেহেদী হাসান দাবি করেন, সংবাদ সম্মেলন শেষে বাড়ি ফেরার পথে রেলগেটে পৌঁছানো মাত্রই হাবিব গ্রুপ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তার পক্ষের নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হলে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাবিব গ্রুপের পক্ষ থেকে ইমরুল কায়েস সুমন থানার অফিসার ইনচার্জকে প্রভাবিত করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সুমনের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এদিকে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় শহরসহ গ্রামের মানুষগুলোর মধ্যে আতংক সৃষ্টি হয়েছে।