ঈশ্বরদীর মুলাডুলি কৃষি খামারে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কোটি টাকা মূল্যের বৃক্ষ নিধন, জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ
———
ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি।। উত্তরবঙ্গের অন্যতম রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান নর্থবেঙ্গল সুগার মিলের আওতাধীন ঈশ্বরদীর মুলাডুলি কৃষি খামারের জমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ও নিলাম প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রায় তিন হাজারের বেশি মূল্যবান গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য আনুমানিক কোটি টাকার ওপরে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই অনৈতিক কর্মকান্ড সংঘটিত করার বিপুল অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)-এর পানাশি সেচ প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি ‘ভ্যালি ইরিগেশন’ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে মুলাডুলি খামারের সরদারপাড়া থেকে ১০ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত ক্যানাল খননের সময় ক্যানালের দু’পাশে থাকা বহু বছরের পুরোনো মেহগুনি, শিশু, খয়ের, রেন্টি কোড়ই ও খেজুর গাছ সহ প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। সরকারি বিধি অনুযায়ী বনবিভাগের মাধ্যমে গাছের মূল্য নির্ধারণ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং নিলাম বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিক্রির বাধ্যবাধকতা থাকলেও এক্ষেত্রে তার কোনো কিছুই অনুসরণ করা হয়নি। গোপনে ও তড়িঘড়ি করে গাছ কেটে তা নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে সরবরাহ করা হয়েছে।
এ ব্যাপারে মুলাডুলি খামারের ইনচার্জ আনোয়ারুল ইসলাম আমিনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি গাছ কাটার ব্যাপারে সত্যতা স্বীকার করে বলেন, গাছ কাটা হয়েছে তবে সেগুলো নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে আগুন হিটের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। ভ্যালি ইরিগেশন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এলাকাবাসী, মিল ও দেশ উপকৃত হবে এবং অযৌক্তিক ভাবে গাছগুলো কাটা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে বলেন, প্রকল্পের প্রয়োজনের তুলনায় যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অসংগতিপূর্ণ। গাছ কাটার কারণে খামারের প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়েছে।
এবিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ধরনের ব্যাপক বৃক্ষ নিধনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অনুমোদন ছাড়া গাছ কর্তন করা হলে তা পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এলাকাবাসী জানান, একান্ত প্রয়োজন থাকলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় দরপত্র ও মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে গাছ কাটা যেত। কিন্তু এখানে ইক্ষুর আড়ালে হাজারো গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলানো হয়েছে।
বিষয়টি জানার জন্য নর্থবেঙ্গল সুগার মিলের জিএম (প্রশাসন) আনিসুর রহমানের কার্যালয়ে গেলে তা তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। একইভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফরিদ হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে প্রথমে তাকে অনুপস্থিত দেখানো হয়। পরে তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে দেখা করলেও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে খামারী প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
সে মোতাবেক খামারী প্রধানের সাথে দেখা করার জন্য গেলে খামারি প্রধান বাকী বিল্লাহর কার্যালয়েও তালা ঝুলতে দেখা যায়। মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি!
বিএডিসি ঈশ্বরদী জোনের সহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ), সুমন চন্দ্র বর্মনকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তিনি জেলা প্রধান কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এদিকে বিএডিসি পাবনার নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এবিষয়ে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি নতুন এখানে যোগাদান করেছি। সরকারী খামারের বিষয়টি আজই অবগত হয়েছি। এবিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে প্রেরন করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
প্রেরকঃ এস এম রাজা,
ঈশ্বরদী, পাবনা।
০১৭১১৪৬১৯৫৬